ভূমিকা
বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ইসলামের মহান প্রচারক হযরত শাহজালাল (রহ.)। তিনি কেবল একজন সুফি সাধক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন মহান যোদ্ধা এবং সত্যের পথে অবিচল এক পথপ্রদর্শক। তার মাধ্যমেই সিলেটে ইসলামের সুশীতল ছায়া ছড়িয়ে পড়েছিল। আজ আমরা জানব ইয়েমেনের সেই শাহজাদার গল্প, যিনি মায়া-মমতা ত্যাগ করে আল্লাহর প্রেমে সুদূর বাংলার মাটিতে ইসলাম প্রচার করতে এসেছিলেন।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
হযরত শাহজালাল (রহ.) ১২৭১ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেনের কুনিয়া নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল হযরত মাহমুদ বিন মুহাম্মদ এবং মাতার নাম ছিল সৈয়দা হাসিনা ফাতেমা। তিনি বংশপরম্পরায় সরাসরি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর বংশধর ছিলেন। জন্মের পর থেকেই তার মধ্যে আধ্যাত্মিকতার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
শৈশব ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা
শৈশবে মাতাপিতা ইন্তেকাল করার পর তিনি তার মামা সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.)-এর কাছে বড় হন। তার মামাই ছিলেন তার প্রথম আধ্যাত্মিক গুরু বা পীর। অল্প বয়সেই তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ করেন এবং শরীয়ত ও মারফতের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, তিনি প্রায় ৩০ বছর রোজা রেখেছিলেন এবং কঠিন রিয়াজত করেছিলেন।
হিন্দুস্তানে আগমনের আদেশ ও একমুঠো মাটি
কথিত আছে, যখন শাহজালাল (রহ.)-এর শিক্ষা পূর্ণ হলো, তখন তার মামা ও পীর তাকে একমুঠো মাটি দিয়ে বললেন, "বৎস জালাল, তুমি এই মাটি নিয়ে হিন্দুস্তানে চলে যাও। যেখানে গিয়ে দেখবে ওখানকার মাটির সাথে এই মাটির রং, গন্ধ ও স্বাদ হুবহু মিলে গেছে, সেখানেই তুমি ইসলাম প্রচারের আস্তানা গাড়বে।" সেই পবিত্র মাটির সন্ধানেই তিনি ৩১০ জন সঙ্গী (পরবর্তীতে ৩৬০ জন) নিয়ে হিন্দুস্তানের দিকে রওনা হন।
সিলেট বিজয় ও রাজা গৌর গোবিন্দ
সেই সময় সিলেটের রাজা ছিল অত্যাচারী গৌর গোবিন্দ। মুসলিম প্রজাদের ওপর সে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাত। বোরহান উদ্দিন নামক এক মুসলমান তার সন্তানের জন্মের খুশিতে গরু জবাই করার অপরাধে গৌর গোবিন্দ তার হাত কেটে ফেলে এবং দুধের শিশুকে হত্যা করে। এই আর্তনাদ শুনে শাহজালাল (রহ.) তৎকালীন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি নাসির উদ্দিনের সাথে যোগ দিয়ে সিলেট অভিযানে যান।
নবিগঞ্জের কাছে বরাক নদী পার হওয়ার সময় কোনো নৌকা না পেয়ে শাহজালাল (রহ.) তার জায়নামাজ বিছিয়ে অলৌকিকভাবে নদী পার হন। গৌর গোবিন্দ তার জাদুমন্ত্র দিয়ে পাহাড় সরিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দিলেও শাহজালাল (রহ.)-এর একটি আজানের ধ্বনিতে গৌর গোবিন্দের বিশাল অট্টালিকা ভেঙে পড়ে এবং রাজা পালিয়ে যায়। অবশেষে শাহজালাল (রহ.) সিলেট বিজয় করেন।
মামা প্রদত্ত মাটির মিল পাওয়া
সিলেট বিজয়ের পর শাহজালাল (রহ.) দেখলেন, ইয়েমেন থেকে আনা সেই পবিত্র মাটির সাথে সিলেটের মাটির হুবহু মিল রয়েছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এটাই তার ইসলাম প্রচারের নির্দিষ্ট স্থান। এরপর তিনি সিলেটের বিভিন্ন স্থানে তার সঙ্গীদের (৩৬০ আউলিয়া) পাঠিয়ে দেন ইসলাম প্রচারের জন্য।
আধ্যাত্মিক জীবন ও অলৌকিক ঘটনাবলী
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর জীবনে অজস্র অলৌকিক বা 'কেরামতি'র কথা পাওয়া যায়:
- গজাড় মাছ: মাজারের পুকুরে যে বড় বড় গজাড় মাছ দেখা যায়, লোকমুখে প্রচলিত আছে এগুলো রাজার অভিশপ্ত সৈন্যদের রূপান্তরিত রূপ।
- বিগ বাটি ও ডালিম গাছ: তার ব্যবহৃত থালা-বাসন ও আসবাবপত্র আজও দর্শনার্থীদের অবাক করে।
- জালালি কবুতর: শাহজালাল (রহ.)-এর প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে এক বিশেষ জাতের নীল রঙের কবুতর সারা সিলেটে দেখা যায়, যা 'জালালি কবুতর' নামে পরিচিত।
ইসলাম প্রচারে অবদান
শাহজালাল (রহ.)-এর প্রচেষ্টায় সিলেটের ঘরে ঘরে ইসলামের আলো পৌঁছে যায়। তার অসাম্প্রদায়িক আচরণ, সত্যবাদিতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখে হাজার হাজার হিন্দু ও বৌদ্ধ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি সিলেটে একটি মাদ্রাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন যা তখন জ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
ইন্তেকাল ও মাজার শরীফ
১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৩৪৭) এই মহান সাধক ইহলোক ত্যাগ করেন। সিলেটের দরগাহ মহল্লায় তাকে সমাহিত করা হয়। আজও প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ তার মাজার জিয়ারত করতে আসেন। তার মাজার সংলগ্ন মসজিদটি স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য উদাহরণ।
উপসংহার
হযরত শাহজালাল (রহ.) কেবল সিলেটের নয়, বরং পুরো বাংলার গর্ব। তার ত্যাগ ও সংগ্রামের কারণেই আমরা আজ ইসলামের পথে চলতে পারছি। তার জীবন থেকে আমাদের ধৈর্য এবং ঈমানের ওপর অটল থাকার শিক্ষা নিতে হবে।

Post a Comment